
দীর্ঘ উপাখ্যান
আমরা তোমাদের ভুলবো না। এই পথ কখনই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ছিল রক্তে লেখা এ পথের প্রতিটি পরতে পরতে প্রতিটি খুলো কণায়, প্রতিটি নিশ্বাসে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই পথের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের দীর্ঘ উপাখ্যান।
আছে গুম হয়ে ঘরে না- ফেরা মানুষদের জন্য মায়েদের জানালার ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা নির্ঘুম রাত। আছে স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাস, সন্তানের প্রশ্ন, বাবার নীরবতা। আছে কারাগারের কনডেম সেলের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কাটানো অসংখ্য অন্ধকার প্রহর।
আর আছে জুলাই-
একটি মাস নয়, একটি জাগরণ; একটি তারিখ নয়, একটি রক্তাক্ত প্রত্যয়।
বাঁধন
কুরবানির গরু জবাইয়ের দৃশ্য আমরা দেখেছি। পা বেঁধে দেওয়া হয়, চোখ ঢেকে দেওয়া হয়-তারপর ধারালো ছুরির ঝলক।
কাজ শেষ হলে খুলে দেওয়া হয় রশি।
কিন্তু এই দেশে মানুষকেও বেঁধে হত্যা করা হয়েছে-রশি খুলে দেওয়ার কেউ ছিল না।
চট্টগ্রামের নুরুকে মধ্যরাতে সন্তানদের পাশ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই কর্ণফুলীর তীরে পড়ে ছিল তার নিথর দেহ-হাত-পা বাঁধা, চোখ গামছায় শক্ত করে আটকানো। বুক আর মাথায় গুলির দাগ। মৃত্যু তাকে নিয়ে গেছে, কিন্তু হত্যাকারীরা তার বাঁধন খোলার প্রয়োজনও মনে করেনি।
মানুষ কি এতটাই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল?
খিলগাঁওয়ের জনিকে ১৮টি গুলি করা হয়েছিল-মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য। সে হাতজোড় করে বলেছিল, ‘আমি চলে যাব, আর রাজনীতি করব না।’ তার আকুতি বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল, পাষাণ হৃদয়ে পৌঁছায়নি।
তার মৃত্যুর পর পৃথিবীতে আসে একটি শিশু-নহর। সে জানে না রাজনীতি কী, জানে না রাষ্ট্র কী। সে শুধু জিজ্ঞেস করে-‘আমার বাবা কেন ফেরে না?’
জুলাই: আগুনের ডাক
তারপর এলো জুলাই।
রংপুরের আকাশের নিচে এক তরুণ-আবু সাইদ-দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়াল গুলির সামনে।
সেই দৃশ্য ছিল বজ্রপাতের মতো।
তার কণ্ঠে যেন উচ্চারিত হয়েছিল-‘অনেক হয়েছে, আর না।’
সেই ডাক হ্যামিলনের বংশীবাদকের সুরের মতো ছড়িয়ে পড়ল। তরুণ-প্রবীণ, ছাত্র-শ্রমিক-সবাই যেন জনল সেই আহ্বান। ভয়ের শেকল ছিঁড়ে মানুষ রাস্তায় নামল। রক্ত ঝরল, কিন্তু মাথা নত হলো না।
ওয়াসিম, মুগ্ধ-নামগুলো হয়ে উঠল সিঁড়ি, যার ওপর পা রেখে একটি জাতি উঠে দাঁড়াল। দুই সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে দেশ ফিরে পেল নিজের মুখ।